লা শাতেলিয়ার নীতি খুবই মজাদার একটি নীতি। এই একটি নীতি দিয়েই তুমি হতে পারো কোটিপতি। তবে সেজন্য তোমাকে আগে বুঝতে হবে লা শাতেলিয়ার নীতি। তবে বুঝে আসা যাক।
লা শাতেলিয়ার নীতি বুঝতে হলে এর আগে আমাদের আরও কিছু জিনিস বুঝতে হবে। সেগুলো হল উভমুখী বিক্রিয়া, তাপ উৎপাদী বিক্রিয়া, তাপহারী বিক্রিয়া, বিক্রিয়ার হার ও রাসায়নিক সাম্যাবস্থা।
উভমুখী বিক্রিয়াঃ
যেসকল বিক্রিয়ায় একই সময়ে বিক্রিয়ক থেকে উৎপাদ এবং উৎপাদ থেকে বিক্রিয়কে পরিণত হয় তাদের উভমুখী বিক্রিয়া বলে। যেমনঃ
হাইড্রোজেন ও আয়োডিন গ্যাস বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন আয়োডাইড গ্যাস উৎপন্ন করে। আবার একই সময়ে উৎপন্ন হাইড্রোজেন আয়োডাইড গ্যাস ভেঙ্গে হাইড্রোজেন ও আয়োডিন গ্যাস উৎপন্ন করে। উভমুখী বিক্রিয়াকে “
” এই চিহ্নর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। আর উভমুখী বিক্রিয়ার যেই বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক থেকে উৎপাদে পরিণত হয় তাকে বলে সম্মুখমুখী বিক্রিয়া এবং যে বিক্রিয়ায় উৎপাদ ভেঙ্গে বিক্রিয়কে পরিণত হয় তাকে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়া বলে।
![]()
তাপ উৎপাদী বিক্রিয়াঃ
যেসকল বিক্রিয়ায় বিক্রিয়া ঘটার ফলে তাপ উৎপন্ন হয় তাদের তাপ উৎপাদী বিক্রিয়া বলে। যেমনঃ
তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ায়
ঋণাত্মক হয়।
তাপহারী বিক্রিয়াঃ
যেসকল বিক্রিয়ায়, বিক্রিয়া ঘটার সময় পরিবেশ থেকে তাপ শোষণ হয় তাদের তাপহারী বিক্রিয়া বলে। যেমনঃ
তাপহারী বিক্রিয়ায়
ধনাত্মক হয়।
বিক্রিয়ার হারঃ
কোন একক সময়ে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রার হ্রাস বা উৎপাদের ঘনমাত্রা বৃদ্ধির হারকে বিক্রিয়ার হার বলে।
বিক্রিয়ার হার= বিক্রিয়ক বা উৎপাদের ঘনমাত্রার পরিবর্তন
সময়
# বিক্রিয়ার হারের একক ![]()
রাসায়নিক সাম্যাবস্থাঃ
যখন কোন উভমুখী বিক্রিয়ার সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার এবং পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার সমান হয় তখন এই অবস্থাকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা বলে।
রাসায়নিক বিক্রিয়া যখন সাম্যাবস্থায় থাকে তখন বাইরে থেকে মনে হয় বিক্রিয়া থেমে আছে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বিক্রিয়া থেমে থাকে না। প্রকৃতপক্ষে সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার এবং পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার সমান হয় অর্থাৎ, কোন একক সময়ে যেটুকু বিক্রিয়ক বিক্রিয়া করে উৎপাদ তৈরি করে তেমনি একই পরিমাণ উৎপাদ ভেঙ্গে বিক্রিয়কে পরিণত হয়। তাই বিক্রিয়ক বা উৎপাদ কোনটির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়না। পরিমাণের কোন পরিবর্তন না হওয়ায় আমাদের মনে হয় বিক্রিয়া বন্ধ আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিক্রিয়া বন্ধ হয়না।
লা শাতেলিয়ার নীতিঃ
বিজ্ঞানী লা শাতেলিয়ার বলেছেন “ কোন বিক্রিয়া সাম্যাবস্থায় থাকাকালীন সময়ে এর কোন নিয়ামকের (তাপ, চাপ, ঘনমাত্রা) পরিবর্তন করলে সাম্যাবস্থা এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যেন নিয়ামক পরিবর্তনের ফলাফল প্রশমিত হয়।”
এখন আমরা দেখে আসি কোন নিয়ামক পরিবর্তনে কি রকম পরিবর্তন ঘটে।
সাম্যাবস্থায় তাপের প্রভাবঃ
কোন বিক্রিয়াকে তাপ দিলে সেই বিক্রিয়ার তাপমাত্রা বাড়বে। লা শাতেলিয়ার নীতি অনুযায়ী সেই বাড়তি তাপকে প্রশমিত করার জন্য বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। এই পরিবর্তন মূলত দুই ধরণের হয়। একটি হল তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি তাপহারী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে।
তাপ উৎপাদী বিক্রিয়াঃ
তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ায় সম্মুখমুখী বিক্রিয়াতে তাপ বৃদ্ধি পায় এবং পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়াতে তাপ হ্রাস পায়। তাপ উৎপাদী বিক্রিয়াতে যখন তাপ দেওয়া হয় তখন তখন অতিরিক্ত তাপ প্রশমন করার প্রয়োজন হয়। যেহেতু পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়াতে তাপ হ্রাস পায় সেহেতু পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং বেশি পরিমাণে উৎপাদ ভেঙ্গে বিক্রিয়কে পরিণত হতে থাকে।
আবার যদি তাপ কমিয়ে আনা হয় তখন তার ঠিক উল্টা কাজটি ঘটে থাকে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত তাপ তৈরির প্রয়োজন হয়। যেহেতু সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার ফলে তাপ উৎপন্ন হয় তাই তখন সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং অধিক পরিমাণে বিক্রিয়ক বিক্রিয়া করে অধিক পরিমাণে উৎপাদে পরিণত করে।
তাপহারী বিক্রিয়াঃ
তাপহারী বিক্রিয়ায় সম্মুখমুখী বিক্রিয়াতে তাপ হ্রাস পায় এবং পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়াতে তাপ বৃদ্ধি পায়। তাপহারী বিক্রিয়াতে যখন তাপ দেওয়া হয় তখন তখন অতিরিক্ত তাপ প্রশমন করার প্রয়োজন হয়। যেহেতু সম্মুখমুখী বিক্রিয়াতে তাপ হ্রাস পায় সেহেতু সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং বেশি পরিমাণে বিক্রিয়ক বিক্রিয়া করে উৎপাদে পরিণত হতে থাকে।
আবার যদি তাপ কমিয়ে আনা হয় তখন তার ঠিক উল্টা কাজটি ঘটে থাকে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত তাপ তৈরির প্রয়োজন হয়। যেহেতু পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার ফলে তাপ উৎপন্ন হয় তাই তখন পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং অধিক পরিমাণে উৎপাদ ভেঙ্গে বিক্রিয়কে পরিণত করে।
সাম্যাবস্থায় চাপের প্রভাবঃ
একই আয়তনে যার মোল সংখ্যা বেশি তার চাপ বেশি । উপরের বিক্রিয়াটির ক্ষেত্রে বিক্রিয়কের মোল সংখ্যা (3+1=4) উৎপাদের মোল সংখ্যার (2) থেকে বেশি। অর্থাৎ সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার ফলে মোল সংখ্যার হ্রাস পায় আর এর ফলে চাপেরও হ্রাস ঘটে। আবার পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ায় ২ অণু অ্যামোনিয়া ভেঙ্গে ১ অণু নাইট্রোজেন এবং তিন অণু হাইড্রোজেন উৎপন্ন করে। এক্ষেত্রে অণুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে চাপও বৃদ্ধি পায়।
এখন যদি বিক্রিয়াটিতে বাইরে থেকে চাপ বৃদ্ধি করা হয় তবে লা শাতেলিয়ার নীতি অনুসারে চাপ কমাতে চাবে। চাপ হ্রাসের জন্য বিক্রিয়াটি সম্মুখমুখী হবে, যেহেতু সম্মুখমুখী বিক্রিয়ায় চাপের হ্রাস ঘটে। আবার যদি বাহ্যিকভাবে চাপ হ্রাস করা হয়, তবে চাপ বৃদ্ধি করার জন্য বিক্রিয়া পশ্চাৎমুখী হবে।
![]()
উপরের বিক্রিয়াটিতে ২ অণু গ্যাস বিক্রিয়া করে যেই উৎপাদ গ্যাস তৈরি করে তাও দুই অণু পরিমাণ তৈরি হয়। ফলে বিক্রিয়ার পুর্বে এবং বিক্রিয়ার পরে চাপের কোন তারতম্য হয় না। ফলে বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থায় চাপের প্রভাব নেই।
ঘনমাত্রাঃ
ঘনমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়। বিক্রিয়া সাম্যাবস্থায় থাকাকালীন সময়ে বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা বাড়ালে বিক্রিয়ক সমুহের বিক্রিয়ার হার বেড়ে যায় ফলে সাম্যাবস্থা ডান দিকে সরে যায়। আবার যদি উৎপাদ এর পরিমাণ বাড়ানো হয় তবে উৎপাদসমুহের বিপরীতমুখী বিক্রিয়ার হার বেড়ে যায় ফলে সাম্যাবস্থা বাম দিকে সরে যায়।
ব্যাবসায় বাস্তব প্রয়োগ:
ধরা যাক, একটি অ্যামোনিয়া উৎপাদন কোম্পানির নাম Amine, তারা অ্যামোনিয়া উৎপাদনের জন্য কিছু পরিমাণ কাঁচামাল কিনে আনলো। কিনে আনা কাঁচামাল থেকে Amine কোম্পানি যত বেশি অ্যামোনিয়া উৎপাদন করতে পারবে তাদের লাভ ততো বেশি হবে। কিন্তু অ্যামোনিয়া উৎপাদন শুরু করতে গিয়ে তারা দেখল যে কিছু পরিমাণ অ্যামোনিয়া উৎপাদনের পর আর উৎপাদন হয়না। যে পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে সেই পরিমাণ খুব বেশি লাভজনক নয়।
এখন Amine এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতেই লা শাতেলিয়ার নীতি প্রয়োগ করে। যেহেতু বিক্রিয়া সাম্যাবস্থায় পৌঁছে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় তাই যেন সাম্যাবস্থার অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য তাপ, চাপ ও ঘনমাত্রা এর পরিবর্তন করবে। ফলে উৎপাদন ভালো হবে আর ব্যবসা হবে লাভজনক।
এখন আমাদের মনে হতে পারে , অ্যামোনিয়া উৎপাদন তাপ উৎপাদী বিক্রিয়া হওয়ায় তাপ হ্রাস করলে উৎপাদন বাড়বে তাহলে আমরা অনেক বেশি তাপ হ্রাস করবো তাহলে আমরা বেশি উৎপাদ পাবো। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। তাপ ও চাপ বৃদ্ধি কিংবা হ্রাস এর জন্য বিভিন্ন অবকাঠামোগত খরচ সহ নানা খরচ হয়। উৎপাদনের এক পর্যায়ে দেখা যায় যে এই খরচ এর চেয়ে উৎপাদন কম। তাই বাস্তবিক ভাবে খালি তাপ কিংবা চাপ হ্রাস-বৃদ্ধি করলেই হবেনা বরং খরচের কথা চিন্তা করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ পর্যন্ত পরিবর্তনে লাভজনক ফলাফল পাওয়া যায়।
একটু ভিন্নভাবে ভাবা যাকঃ
আমরা এখন একটু ভিন্নভাবে ভাববো। প্রথমে আমরা প্রশ্ন পড়বো এবং দুই মিনিট এর উত্তর খুঁজবো এবং পরে এর উত্তরটি দেখবো।
প্রশ্নঃ- আমরা সবাই জানি যে তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ায় তাপ বৃদ্ধি করলে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় আবার তাপহারী বিক্রিয়ার তাপ বৃদ্ধি করলে সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ার তাপ বৃদ্ধি করলে সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার ও তাপহারী বিক্রিয়ার তাপ বৃদ্ধি করলে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হারের কেমন পরিবর্তন ঘটে?
আমরা অধিকাংশ চিন্তা করেছি যে তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ার তাপ বৃদ্ধি করলে সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হার ও তাপহারী বিক্রিয়ার তাপ বৃদ্ধি করলে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার হ্রাস পায়। কিন্তু বাস্তবে তা হয়না। এক্ষেত্রেও বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমরা একটু যদি বিস্তারিত চিন্তা করি যে যখন তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ায় তাপ বৃদ্ধি করলে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় তখন বেশি উৎপাদ ভেঙ্গে বিক্রিয়কে পরিণত হতে থাকে। এতে কি হয়? বিক্রিয়কের ঘনমাত্রা আবার বৃদ্ধি পায়। আর আমরা কি পড়েছি? ঘনমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়। তাহলে কি হচ্ছে? তাপ উৎপাদী বিক্রিয়ায় তাপ বৃদ্ধি করলে পশ্চাৎমুখী বিক্রিয়ার হার যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি সম্মুখমুখী বিক্রিয়ার হারও বৃদ্ধি পায়। আবার তাপহারী বিক্রিয়ার ক্ষেতরেও এভাবেই কাজটি ঘটে।
এখন মনে হতে পারে, দুই দিকেই যদি বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় তাহলে উৎপাদন বাড়ে- কমে কিভাবে? কিংবা সাম্যাবস্থার পরিবর্তনই বা হয় কেন? আসলে নিয়ামক পরিবর্তনের ফলে প্রথমে যেই বিক্রিয়ার হার বাড়ে তা হঠাৎ করেই অনেক বেশি বেড়ে যায়, আর ঘনমাত্রার জন্য যেই বিক্রিয়ার হার বাড়ে তা খুব ধিরে ধিরে বাড়তে থাকে। এভাবে এক পর্যায়ে তারা আবার সাম্যাবস্থায় পৌছায়।